ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে আজ ঢাকায় শুরু হচ্ছে বিনিয়োগ সম্মেলন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫’ শীর্ষক এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), যা চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। চারদিনের সম্মেলনে আলোচনা আর মতবিনিময়ের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামনে থাকছে ব্যবসার পরিবেশ দেখার সুযোগও।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে সম্মেলনের নানা দিক তুলে ধরেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। আয়োজিত এ সম্মেলনে ৪০টি দেশের প্রায় ছয়শ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নেবেন। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয়া হবে পাঁচ বিনিয়োগকারীকে। পাশাপাশি মার্কিন মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নাসা) সঙ্গে একটি বেসামরিক চুক্তিও হতে পারে বলে জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলেও বহির্বিশ্বে এ নিয়ে কিছুটা ভুল ধারণা রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের সঠিক উপলব্ধি করানো এবং দেশের সত্যিকারের চিত্র তাদের সামনে তুলে ধরা। আমরা বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে একটি বাণিজ্যের পাইপলাইন তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে বিনিয়োগ আসবে।’”
সম্মেলনে নতুন বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও পরিবেশের উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশ এবং আগামী ১০ বছর পরের বাংলাদেশ কেমন হতে পারে, তার একটি চিত্র বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
বিডার চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ সম্মেলন প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। পুরো সম্মেলন পরিচালিত হবে স্টারলিংক ডিভাইস দিয়ে। অংশগ্রহণকারীরা তাদের ব্যক্তিগত ডিভাইস স্টারলিংকের সঙ্গে কানেক্ট করে এ উন্নত ইন্টারনেট পরিষেবার অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।’
স্টারলিংকের বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে বিডা চেয়ারম্যান জানান, স্টারলিংক বিডায় রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেছিল এবং তা সম্পন্ন হয়েছে। তাদের পরবর্তী ধাপ হলো এনজিএসও লাইসেন্স, এটার জন্য তারা শিগগিরই আবেদন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিডা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই লাইসেন্স দেয়ার চেষ্টা করবে। লাইসেন্স পাওয়ার পরই স্টারলিংক তাদের ডিভাইস ইনস্টলের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারবে।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে জারা গ্রুপ, ডিপি ওয়ার্ল্ড, ব্রিটিশ ব্যারোনেস, স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি, গিওর্দানো, এক্সিলারেট এনার্জি এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের উবার মেটা। এছাড়া বি ক্যাপিটাল, গবি, কনজাংশন, মারুবেনি ও জিএফআরের মতো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো স্টার্টআপ বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে কাজ করবে। সম্মেলনে ইলোন মাস্কের অংশগ্রহণের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তিনি এবারের সম্মেলনে আসছেন না, এটা নিশ্চিত করে আমি বলতে পারি।’
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে বিডা চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং এ স্থিতিশীলতার জন্য হয়তো আইএমএফের তহবিল নাও লাগতে পারে। গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, যা ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে। এছাড়া গালফ মার্কেটের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এলএনজি আমদানির মাধ্যমে জ্বালানির উৎসকে আরো সুসংহত করা হবে। শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সহায়তা প্রসঙ্গে ব্যাংক খাতে সংকট প্রসঙ্গে আশিক চৌধুরী জানান, ভালো কোয়ালিটির বিনিয়োগকারীদের ফাইন্যান্সিং নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। একজন ভালো বিনিয়োগকারীর লোন পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করেন বিডার চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এখান থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো মুনাফা অর্জন করতে পারে। বিগত বিনিয়োগকারীদের উদাহরণ টেনে তিনি দেখান যে তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। ব্যাংকিং সংকটের কারণে লিকুইডিটি সমস্যা হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
বিনিয়োগ সম্মেলনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে। বিডা চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন থাকেন এবং সরকার সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ও সম্মতির মাধ্যমেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে আগ্রহী।’
এ বিনিয়োগ সম্মেলন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক হবে বলে আশা করেন বিডার চেয়ারম্যান। সম্মেলনের মূল পর্ব বুধবার উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একজন স্থানীয় ও একজন বিদেশীকে টেকসই উদ্ভাবনের জন্য পুরস্কার দেয়া হবে। এছাড়া বাংলাদেশে ২০-২৫ বছর ধরে বিনিয়োগ করা একজনকে সম্মাননার পাশাপাশি সম্মানসূচক নাগরিকত্ব নেয়ারও প্রস্তাব দেয়া হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ফাঁকে তিন-চারটা আয়োজন চলতে থাকবে। এর মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি মেলাও আছে, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা কিছু স্টার্টআপের সঙ্গে কথা বলবেন প্রধান উপদেষ্টা।